চলমান বিশ্ব-পরিস্থিতির কয়েকটি বিষয়
মার্কিন-চীন আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছে
১৯৭৬ সালে কমরেড মাওয়ের মৃত্যুর একমাস পর ক্যুদেতার মাধ্যমে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পরাজিত শক্তি চীনের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। তখন থেকে চীন রাষ্ট্রটি পুঁজিবাদের পথ অনুসরণ করে চলেছে। চীনা রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক সকল অর্জনগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এবং সাম্রাজ্যবাদের সকল বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। উদীয়মান চীনা সাম্রাজ্যবাদ রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানার পুঁজির বিকাশের মধ্যদিয়ে বিশ্ববাজারে অন্যসকল সাম্রাজ্যবাদকে অতিক্রম করে মার্কিনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। সবই তারা করছে সমাজতন্ত্র, কমিউনিস্ট পার্টির নামে।
মার্কিন-চীন দ্বন্দ্ব এখন আর নিছক বাণিজ্য যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বাবাজার নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বন্টনের লক্ষ্যে দেশে দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ফলে দু’দশক আগে থেকে শুরু করা মার্কিনের নেতৃত্বে আগ্রাসন ও ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’এখন গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ এই যুদ্ধের অর্জনে এখন আর মার্কিনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। চীন ও রুশ সাম্রাজ্যবাদ হস্তক্ষেপ করছে। জো বাইডেনের ইউরোপ সফর ও জি-৭ এর সভায় চীনকে প্রতিরোধ ও মোকাবিলার ঘোষণা করেছে। চীনও বলেছে এখন আর সে দিন নেই গুটি কয়েক দেশের সিদ্ধান্তে যে কোন দেশের ওপর আক্রমণ চালানোর। ১ জুলাই ২০২১ বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে চীনের তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেছে- কোন বিদেশী শক্তি চীনকে দমন করতে চাইলে নিদারুন পরিণতি ভোগ করতে হবে।
বিশ্ব রাজনীতিতে প্রকৃত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের বিপ্লবী আন্দোলনের দুর্বলতা ও অনুপস্থিতির কারণে এশিয়া আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় বিশেষত মিয়ানমার, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, কিউবা, হংকং, তাইওয়ান, পুরানো সরকারগুলোর বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এখন এই, না হয় ওই, সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়ছে। আর সাম্রাজ্যবাদীরা এই আন্দোলনকে কোথাও দ্বিরাষ্ট্র, কোথাও সামরিক শাসন, কোথাও গণতন্ত্রের নামে সংসদীয় স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে সমাধান করছে। নিপীড়িত জাতি-জনগণ জীবন ও জীবিকার লড়াই করে চলেছেন। মুক্তির পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে।
আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও নয়া উপনিবেশিক দেশসমূহে নীচুমাত্রার যুদ্ধ পরিচালনার নীতির কারণে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আকারে প্রকাশিত না হলেও রাষ্ট্র ও সমাজকাঠামোতে ফ্যাসিবাদ বিকাশ লাভ করেছে। কাজেই মানবজাতি ও প্রকৃতি জগৎকে সুরক্ষার জন্য সাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংস করে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার দাবি অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
মিয়ানমার
সাম্রাজ্যবাদী চীনের মদদে ২০২০ সালের ১ ফেব্রæয়ারি সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। চীনের সাম্রাজ্যবাদী বিকাশ ও আগামী দিনে বিশ্বের এক নম্বর মোড়ল হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও হিস্যা ভাগাভাগির প্রতিদ্বন্দ্বীতায় লিপ্ত হয়েছে। বাণিজ্যিক যুদ্ধের সাথে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে আবির্ভূত হয়েছে।
মিয়ানমারের নিপীড়িত জাতি-জনগণের বড় একটি অংশ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন-বিক্ষোভ করছেন। কিন্তু ইতোমধ্যেই জনগণের এই ন্যায্য আকাক্সক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সুচি’র ছায়া সরকারের মাধ্যমে মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ চালকের আসনে বসে পড়েছে। চীনকে মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত এই চার জাতি নিয়ে গঠিত হয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক জোট কোয়াড। যাকে পূর্ব ন্যাটো জোট হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভালো-মন্দ এখন কোয়াডে যুক্ত হওয়া ও না হওয়ার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।
মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় দুই ডজনের বেশি জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই লড়াই করছে। এরসঙ্গে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রæপ আরসাও যুক্ত হয়েছে। যাদেরকে সুচির নেতৃত্বাধীন সরকারের সেনাবাহিনী আরাকান থেকে নির্মমভাবে উচ্ছেদ করেছে। সশস্ত্র ও গণ-বিক্ষোভেকারী এসকল বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে একত্রে সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়া ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস’ বা জনগণের প্রতিরক্ষা দল হিসেবে তুলে ধরছে। এসকল সশস্ত্র গ্রপের লক্ষ্য এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেদিয়ে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা। যেগুলোর অধিকাংশই কখনো চীন কখনো মার্কিনের মদদ পেয়েছে/পাচ্ছে। তাদের ওপর ভারতীয় সম্প্রসরণবাদের কালো হাতের স্পর্শও রয়েছে।
পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের সঙ্গে দেশটির ছায়া সরকার (সু চির নেতৃত্বাধীন) ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের সম্পর্ক রয়েছে ।
ব্যাপক সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখে পড়লে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের সেনাসদস্যদের বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে নামিয়ে দিতে পারে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি হবে। তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হবেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। সহিংসতা বাড়লে বাস্তুচ্যুতের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। মিয়ানমারে চলমান বিক্ষোভের পরিস্থিতিতে গভীরতর আর্থিক সংকটে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দ্রুত গতিতে বাড়ছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা জানিয়েছে। সেইসঙ্গে করোনার ভারতীয় ডেল্টা ভেরিয়েন্টের সংক্রমণ ভয়াবহ রূপে ছড়িয়ে পড়ছে।
জাতিসংঘের গত সপ্তাহের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এখন পর্যন্ত মিয়ানমারে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
কাজেই মিয়ানমারের নিপীড়িত জাতি-জনগণকে সকল সাম্রাজ্যবাদী বøকের হাতিয়ার হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সকল সাম্রাজ্যবাদ ও দালাল মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া ও সামরিক জান্তার উচ্ছেদের বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।
ফিলিস্তিন
আমেরিকায় বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর যেসব বুর্জোয়া ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা অলীক আশা পোষণ করছিল যে, এতে বিশ্ব একটা ইতিবাচক পথে অগ্রসর হবে, তাদেরকে হতাশ করে ইসরাইলের নতুন সরকার গাজায় বর্বরোচিত বিমান হামলার মহড়া চালাচ্ছে। কয়েক দফা হামলায় তারা দুই শ’রও বেশি সাধারণ জনগণকে হত্যা করেছে যার অধিকাংশই শিশু ও নারী।
এর বিরুদ্ধে ধর্মবাদী হামাস ও নপুংশক ফাতাহ হম্বিতম্বি করছে আর নিষ্ফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে একদিকে জনগণকে প্রতারণা করছে, অন্যদিকে ইসরাইলকে মোকাবেলায় নিজেদের ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
এ অবস্থায় বরাবরের মত সাম্রাজ্যবাদীরা ফিলিস্তিনে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের নসিহত করছে। অর্থাৎ ইসরাইলের দখলদারিত্ব থাকবে এবং ফিলিস্তিনও তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্যের অধিকার জলাঞ্জলী দিয়ে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী একটি বামন রাষ্ট্র গঠন করবে। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের হামাস, ফাতাহ শাসকেরা এই খেলাই খেলছে।
ফিলিস্তিনের মতো সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত নয়াউপনিবেশিক রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আত্মনির্ভরশীল, দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা করার কর্মসূচিকে তুলে ধরা প্রয়োজন। আর এই কর্মসূচি শ্রেণিগত কারণেই মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া, সামন্তবাদী শোষক, ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদ ও সামরিক-বেসামরিক আমলাদের নেতৃত্বে ও তাদের ফর্মুলায় তুলে ধরা সম্ভব নয়। কেননা শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠাই হবে এই কর্মসূচির লক্ষ্য। কেবলমাত্র শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বাধীন মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের তত্তে¡ সজ্জিত একটি কমিউনিস্ট পার্টি এই কর্মসূচি তুলে ধরতে পারে। যে পার্টির রণনৈতিক লাইন হবে সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়নে জর্জরিত দেশে সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্ততা ও প্রভাব থেকে মুক্ত দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ পরিচালনা করা। এবং সকল সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালাল বুর্জোয়া শ্রণিকে উচ্ছেদ করে, সকল ধরনের ধর্মবাদী রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে নিপীড়িত জনগণের প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
কিউবা
ষাটের দশকে গেরিলা যুদ্ধের মধ্যদিয়ে জাতীয় বিপ্লব ঘটিয়ে বামপন্থী রাজনীতিক ফিদেল কাস্ট্রোর দল ক্ষমতায় এসেছিলো। তারা সমাজতন্ত্রের কথা বললেও সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের মতবাদ মালেমা গ্রহণ করেনি ও বুঝেনি। মালেমার ভিত্তিতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলেনি। ফলে তারা সচেতনভাবে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা বিরোধী কর্মসূচি নিতে ব্যর্থ হয়। এর পরিবর্তে তারা মার্কিনের বিরুদ্ধে জাতীয় চেতনাকে ভিত্তি করে অস্থিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে সোভিয়েত সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদের আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে তারা প্রকৃত সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হতে ব্যর্থ হয়। বিপরীতে মার্কিন বিরোধী এক ধরনের জাতীয় চেতনাসম্পন্ন কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলে।
তারপর থেকে এপর্যন্ত কয়েক দশকে এদেশে তেমন কোনো বড় ধরনের গণবিক্ষোভ দেখা যায়নি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অব্যাহতভাবে কিউবার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চালানোর কারণে, এবং তা সত্ত্বেও, ব্যাপক জনগণ সাধারণভাবে ফিডেলকে সমর্থন দেন।
২০২১-এর করোনা মহামারীকালে এই গণআন্দোলনে দেখা গেল একাংশ মার্কিন মদদ পেয়ে সমাজতন্ত্র বিরোধী স্লোগান দিচ্ছে। একাংশ বলেছে এটা ফিদেলের শাসনব্যবস্থার মতো নয়, তাই ফিদেলের শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে। সরকার এই আন্দোলনকে একদিকে দমন করছে। অন্যদিকে নিজেরাই আন্দোলন করছে। সরকার বলছে তারাই প্রকৃত ফিদেলের অনুসারী।
এসব বক্তব্যের মধ্যদিয়ে এটা পরিষ্কার যে, কিউবায় এতদিন ধরে চলে আসা যে শাসনকাঠামো মার্কিনকে এড়িয়ে সোভিয়েত ও পরে রুশ সাম্রাজ্যবাদকে হাতে নিয়ে টিকেছিল এখন তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। মার্কিনের অর্থনৈতিক অবরোধ মোকাবিলায় টিকে থাকতে হলে রুশের পাশাপাশি চীনা সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের ওপর তাদের নির্ভর করতে হতে পারে। এভাবে তারা অধিকতর সংকটের জালে জড়িয়ে পড়বে এবং ফলে জনগণের বিক্ষোভ ও আন্দোলন তাতে বর্ধিত শর্ত পাবে। বর্তমানের আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক চেতনা উভয় সাম্রাজ্যবাদের কামড়াকামড়ির মধ্যে মিলেমিশে রয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে প্রকৃত সমাজতন্ত্রের পথ গ্রহণ করা এবং সেজন্য মাওবাদের আদর্শে সজ্জিত একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গঠন ছাড়া প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণআন্দোলনও সঠিক পথে বিকশিত হতে পারবে না।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
চলমান বিশ্ব-পরিস্থিতির কয়েকটি বিষয়
মার্কিন-চীন আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব তীব্র হচ্ছে
১৯৭৬ সালে কমরেড মাওয়ের মৃত্যুর একমাস পর ক্যুদেতার মাধ্যমে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পরাজিত শক্তি চীনের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। তখন থেকে চীন রাষ্ট্রটি পুঁজিবাদের পথ অনুসরণ করে চলেছে। চীনা রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক সকল অর্জনগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এবং সাম্রাজ্যবাদের সকল বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। উদীয়মান চীনা সাম্রাজ্যবাদ রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানার পুঁজির বিকাশের মধ্যদিয়ে বিশ্ববাজারে অন্যসকল সাম্রাজ্যবাদকে অতিক্রম করে মার্কিনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। সবই তারা করছে সমাজতন্ত্র, কমিউনিস্ট পার্টির নামে।
মার্কিন-চীন দ্বন্দ্ব এখন আর নিছক বাণিজ্য যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বাবাজার নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বন্টনের লক্ষ্যে দেশে দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ফলে দু’দশক আগে থেকে শুরু করা মার্কিনের নেতৃত্বে আগ্রাসন ও ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’এখন গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ এই যুদ্ধের অর্জনে এখন আর মার্কিনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। চীন ও রুশ সাম্রাজ্যবাদ হস্তক্ষেপ করছে। জো বাইডেনের ইউরোপ সফর ও জি-৭ এর সভায় চীনকে প্রতিরোধ ও মোকাবিলার ঘোষণা করেছে। চীনও বলেছে এখন আর সে দিন নেই গুটি কয়েক দেশের সিদ্ধান্তে যে কোন দেশের ওপর আক্রমণ চালানোর। ১ জুলাই ২০২১ বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে চীনের তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেছে- কোন বিদেশী শক্তি চীনকে দমন করতে চাইলে নিদারুন পরিণতি ভোগ করতে হবে।
বিশ্ব রাজনীতিতে প্রকৃত কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের বিপ্লবী আন্দোলনের দুর্বলতা ও অনুপস্থিতির কারণে এশিয়া আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় বিশেষত মিয়ানমার, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, কিউবা, হংকং, তাইওয়ান, পুরানো সরকারগুলোর বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এখন এই, না হয় ওই, সাম্রাজ্যবাদের কবলে পড়ছে। আর সাম্রাজ্যবাদীরা এই আন্দোলনকে কোথাও দ্বিরাষ্ট্র, কোথাও সামরিক শাসন, কোথাও গণতন্ত্রের নামে সংসদীয় স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে সমাধান করছে। নিপীড়িত জাতি-জনগণ জীবন ও জীবিকার লড়াই করে চলেছেন। মুক্তির পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে।
আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও নয়া উপনিবেশিক দেশসমূহে নীচুমাত্রার যুদ্ধ পরিচালনার নীতির কারণে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আকারে প্রকাশিত না হলেও রাষ্ট্র ও সমাজকাঠামোতে ফ্যাসিবাদ বিকাশ লাভ করেছে। কাজেই মানবজাতি ও প্রকৃতি জগৎকে সুরক্ষার জন্য সাম্রাজ্যবাদকে ধ্বংস করে সমাজতন্ত্র-কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার দাবি অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
মিয়ানমার
সাম্রাজ্যবাদী চীনের মদদে ২০২০ সালের ১ ফেব্রæয়ারি সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। চীনের সাম্রাজ্যবাদী বিকাশ ও আগামী দিনে বিশ্বের এক নম্বর মোড়ল হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও হিস্যা ভাগাভাগির প্রতিদ্বন্দ্বীতায় লিপ্ত হয়েছে। বাণিজ্যিক যুদ্ধের সাথে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে আবির্ভূত হয়েছে।
মিয়ানমারের নিপীড়িত জাতি-জনগণের বড় একটি অংশ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন-বিক্ষোভ করছেন। কিন্তু ইতোমধ্যেই জনগণের এই ন্যায্য আকাক্সক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সুচি’র ছায়া সরকারের মাধ্যমে মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ চালকের আসনে বসে পড়েছে। চীনকে মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত এই চার জাতি নিয়ে গঠিত হয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক জোট কোয়াড। যাকে পূর্ব ন্যাটো জোট হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভালো-মন্দ এখন কোয়াডে যুক্ত হওয়া ও না হওয়ার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে।
মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় দুই ডজনের বেশি জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই লড়াই করছে। এরসঙ্গে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রæপ আরসাও যুক্ত হয়েছে। যাদেরকে সুচির নেতৃত্বাধীন সরকারের সেনাবাহিনী আরাকান থেকে নির্মমভাবে উচ্ছেদ করেছে। সশস্ত্র ও গণ-বিক্ষোভেকারী এসকল বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে একত্রে সাম্রাজ্যবাদী মিডিয়া ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস’ বা জনগণের প্রতিরক্ষা দল হিসেবে তুলে ধরছে। এসকল সশস্ত্র গ্রপের লক্ষ্য এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের মধ্যেদিয়ে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা। যেগুলোর অধিকাংশই কখনো চীন কখনো মার্কিনের মদদ পেয়েছে/পাচ্ছে। তাদের ওপর ভারতীয় সম্প্রসরণবাদের কালো হাতের স্পর্শও রয়েছে।
পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেসের সঙ্গে দেশটির ছায়া সরকার (সু চির নেতৃত্বাধীন) ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের সম্পর্ক রয়েছে ।
ব্যাপক সশস্ত্র বিদ্রোহের মুখে পড়লে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের সেনাসদস্যদের বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে নামিয়ে দিতে পারে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি হবে। তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখোমুখি হবেন নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা। সহিংসতা বাড়লে বাস্তুচ্যুতের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। মিয়ানমারে চলমান বিক্ষোভের পরিস্থিতিতে গভীরতর আর্থিক সংকটে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দ্রুত গতিতে বাড়ছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা জানিয়েছে। সেইসঙ্গে করোনার ভারতীয় ডেল্টা ভেরিয়েন্টের সংক্রমণ ভয়াবহ রূপে ছড়িয়ে পড়ছে।
জাতিসংঘের গত সপ্তাহের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এখন পর্যন্ত মিয়ানমারে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
কাজেই মিয়ানমারের নিপীড়িত জাতি-জনগণকে সকল সাম্রাজ্যবাদী বøকের হাতিয়ার হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সকল সাম্রাজ্যবাদ ও দালাল মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া ও সামরিক জান্তার উচ্ছেদের বিপ্লবী সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।
ফিলিস্তিন
আমেরিকায় বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর যেসব বুর্জোয়া ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তরা অলীক আশা পোষণ করছিল যে, এতে বিশ্ব একটা ইতিবাচক পথে অগ্রসর হবে, তাদেরকে হতাশ করে ইসরাইলের নতুন সরকার গাজায় বর্বরোচিত বিমান হামলার মহড়া চালাচ্ছে। কয়েক দফা হামলায় তারা দুই শ’রও বেশি সাধারণ জনগণকে হত্যা করেছে যার অধিকাংশই শিশু ও নারী।
এর বিরুদ্ধে ধর্মবাদী হামাস ও নপুংশক ফাতাহ হম্বিতম্বি করছে আর নিষ্ফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে একদিকে জনগণকে প্রতারণা করছে, অন্যদিকে ইসরাইলকে মোকাবেলায় নিজেদের ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।
এ অবস্থায় বরাবরের মত সাম্রাজ্যবাদীরা ফিলিস্তিনে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের নসিহত করছে। অর্থাৎ ইসরাইলের দখলদারিত্ব থাকবে এবং ফিলিস্তিনও তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্যের অধিকার জলাঞ্জলী দিয়ে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী একটি বামন রাষ্ট্র গঠন করবে। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের হামাস, ফাতাহ শাসকেরা এই খেলাই খেলছে।
ফিলিস্তিনের মতো সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত নয়াউপনিবেশিক রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আত্মনির্ভরশীল, দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা করার কর্মসূচিকে তুলে ধরা প্রয়োজন। আর এই কর্মসূচি শ্রেণিগত কারণেই মুৎসুদ্দি-বুর্জোয়া, সামন্তবাদী শোষক, ধর্মবাদী ফ্যাসিবাদ ও সামরিক-বেসামরিক আমলাদের নেতৃত্বে ও তাদের ফর্মুলায় তুলে ধরা সম্ভব নয়। কেননা শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তসহ ব্যাপক নিপীড়িত জনগণের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠাই হবে এই কর্মসূচির লক্ষ্য। কেবলমাত্র শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বাধীন মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদের তত্তে¡ সজ্জিত একটি কমিউনিস্ট পার্টি এই কর্মসূচি তুলে ধরতে পারে। যে পার্টির রণনৈতিক লাইন হবে সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়নে জর্জরিত দেশে সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্ততা ও প্রভাব থেকে মুক্ত দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ পরিচালনা করা। এবং সকল সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালাল বুর্জোয়া শ্রণিকে উচ্ছেদ করে, সকল ধরনের ধর্মবাদী রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে নিপীড়িত জনগণের প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা করা।
কিউবা
ষাটের দশকে গেরিলা যুদ্ধের মধ্যদিয়ে জাতীয় বিপ্লব ঘটিয়ে বামপন্থী রাজনীতিক ফিদেল কাস্ট্রোর দল ক্ষমতায় এসেছিলো। তারা সমাজতন্ত্রের কথা বললেও সমাজতন্ত্র-কমিউনিজমের মতবাদ মালেমা গ্রহণ করেনি ও বুঝেনি। মালেমার ভিত্তিতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলেনি। ফলে তারা সচেতনভাবে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা বিরোধী কর্মসূচি নিতে ব্যর্থ হয়। এর পরিবর্তে তারা মার্কিনের বিরুদ্ধে জাতীয় চেতনাকে ভিত্তি করে অস্থিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে সোভিয়েত সামাজিক-সাম্রাজ্যবাদের আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে তারা প্রকৃত সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হতে ব্যর্থ হয়। বিপরীতে মার্কিন বিরোধী এক ধরনের জাতীয় চেতনাসম্পন্ন কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলে।
তারপর থেকে এপর্যন্ত কয়েক দশকে এদেশে তেমন কোনো বড় ধরনের গণবিক্ষোভ দেখা যায়নি। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অব্যাহতভাবে কিউবার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চালানোর কারণে, এবং তা সত্ত্বেও, ব্যাপক জনগণ সাধারণভাবে ফিডেলকে সমর্থন দেন।
২০২১-এর করোনা মহামারীকালে এই গণআন্দোলনে দেখা গেল একাংশ মার্কিন মদদ পেয়ে সমাজতন্ত্র বিরোধী স্লোগান দিচ্ছে। একাংশ বলেছে এটা ফিদেলের শাসনব্যবস্থার মতো নয়, তাই ফিদেলের শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে। সরকার এই আন্দোলনকে একদিকে দমন করছে। অন্যদিকে নিজেরাই আন্দোলন করছে। সরকার বলছে তারাই প্রকৃত ফিদেলের অনুসারী।
এসব বক্তব্যের মধ্যদিয়ে এটা পরিষ্কার যে, কিউবায় এতদিন ধরে চলে আসা যে শাসনকাঠামো মার্কিনকে এড়িয়ে সোভিয়েত ও পরে রুশ সাম্রাজ্যবাদকে হাতে নিয়ে টিকেছিল এখন তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। মার্কিনের অর্থনৈতিক অবরোধ মোকাবিলায় টিকে থাকতে হলে রুশের পাশাপাশি চীনা সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের ওপর তাদের নির্ভর করতে হতে পারে। এভাবে তারা অধিকতর সংকটের জালে জড়িয়ে পড়বে এবং ফলে জনগণের বিক্ষোভ ও আন্দোলন তাতে বর্ধিত শর্ত পাবে। বর্তমানের আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক চেতনা উভয় সাম্রাজ্যবাদের কামড়াকামড়ির মধ্যে মিলেমিশে রয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে প্রকৃত সমাজতন্ত্রের পথ গ্রহণ করা এবং সেজন্য মাওবাদের আদর্শে সজ্জিত একটি বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি গঠন ছাড়া প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী গণআন্দোলনও সঠিক পথে বিকশিত হতে পারবে না।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র
